আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন', সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন স্পিকার
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দুই একদিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন, তিনি বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের কাছে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্পিকার দেশে না থাকায় তিনি এখনও পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি" বলে জানিয়েছেন বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিষয়টাতে তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এখন জাতীয় সংসদের স্পিকার দেশে ফিরলে তার কাছে পদত্যাগপত্র দেবেন রাষ্ট্রপতি।
"রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ যাতে নির্বিঘ্নে হয়, কোনো বিতর্কের সৃষ্টি যেন না হয়– এমন পরিকল্পনা অনুযায়ীই প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা রয়েছে," বলে জানান রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
"আর সেজন্যই স্পিকারের দেশে ফেরার অপেক্ষায়। কারণ রাষ্ট্রপতিকে স্পিকারের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয় এবং রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য রাখা যাবে না।"
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে আছেন। তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে শুক্রবার দেশে ফিরছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরযুক্ত পত্র স্পিকারের উদ্দেশে পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা সংবিধানে নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে দেওয়া মাত্রই তার পদ শূন্য হয় এবং রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয়। সেজন্য স্পিকার দেশে ফিরলে একটা সময় ঠিক করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করবেন।
কেন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিনকে বিএনপির উচ্চ পর্যায় থেকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সেই সুযোগ আছে। তিনি এ-ও উল্লেখ করেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে কিছু বলা হয়নি।
তবে বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের ক্ষেত্রে তার অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে দেখাতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, অসুস্থতা হোক বা মানসিক কারণে হোক, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। স্পিকার দেশে ফিরলেই তিনি পদত্যাগপত্রে সই করবেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড গেছেন গত ১৯শে জুলাই। আগের নির্ধারিত সময় সময় অনুযায়ী ২৬শে জুলাই তার ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু সংসদ সচিবালয় ও বঙ্গভবনের সূত্রগুলো জানাচ্ছেন, স্পিকারের দেশে ফেরার সময়টা এখন এগিয়ে আনা হচ্ছে। তিনি শুক্রবার দেশে ফিরতে পারেন।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়। দেশের প্রথম সারির কয়েকটি পত্রিকাতেও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন এমন খবর প্রকাশিত হয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, সেই আলোচনাও এখন রাজনীতির কেন্দ্রে।
আলোচনায় কার নাম- সচিব নাকি রাজনীতিক
দুদিন ধরে যে গুঞ্জন চলছে, তাতে একজন সচিবের নাম এসেছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারে আসার পর নতুন রাষ্ট্রপতি হতে পারেন এমন ধারণা থেকে বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় এসেছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং নজরুল ইসলাম খান।
এখন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে এই পদে একজন সচিবের নামও আলোচনায় এসেছে।
তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, রাজনীতিক বা বিএনপির বাইরে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে, এমনটা তারা চান না। আর সেক্ষেত্রে তাদের ধারণা, বিএনপিরই একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে এবার রাষ্ট্রপতি করার সম্ভবনা বেশি।
তারা এ-ও বলছেন, তাদের দলের শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। সে ধরনের আলোচনা তাদের মধ্যে এখনও হয়নি।
কারণ রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সেখানে সময় রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে বলে বিএনপির নেতারা মনে করছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার সময়ের শীর্ষ আমলা-পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুধু বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকেই আদেশ দিতে হয়েছে সংসদ বিলুপ্ত করার। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকেও শপথ পড়িয়েছেন তিনি। এছাড়া সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে স্বাক্ষর করতে হয়েছে এই রাষ্ট্রপতিকেই।
গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বসহ বিভিন্ন সংগঠন মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। সে সময় বিএনপি সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে– এমন আশঙ্কার কথা বলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
তখন বিএনপির অবস্থানের কারণে তাকে সরানোর দিকে এগোয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৫ সালের ১১ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি বঙ্গভবন থেকে চলে যেতে চান। তিনি বিদায় নিতে আগ্রহী।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা, তাকে কোণঠাসা করে রাখা– এসব কারণে তিনি তখন 'অপমানবোধ' করার কথাও বলেছিলেন।
গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বিএনপি সরকারে আসার পর সেই সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান হয়েছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরই রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে দেখা গেছে। এমনকি তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য গিয়েছিলেন গত মে মাসে।
তবে এখন তার পদত্যাগের যে গুঞ্জন চলছে, তাতে এমন আলোচনা এসেছে যে, মো. সাহাবুদ্দিন লন্ডন থেকে ফেরার পর বিএনপি সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
আর সেজন্য হঠাৎ করে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
সেসময় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী প্রথম স্থানে থাকা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সময়ের হিসাবে প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে রয়েছেন।
তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এখন মেয়াদ শেষ করার আগেই মো. সাহাবুদ্দিনকে চলে যেতে হচ্ছে বলে বলে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
বঙ্গভবনে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
এর আগে সেসময়কার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী প্রথম স্থানে থাকা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সময়ের হিসাবে প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে রয়েছেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পেশায় একজন আইনজীবী এবং তিনি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেন এবং ১৯৯৫ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।
২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে ওই পদ থেকে পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য বলছে, নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ই ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
মি. সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ছাত্র জীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে পাবনা শহীদ আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি পাস করেন।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আইনে তিনি তিন বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের আমলে শেখ মুজিব হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।