পাঁচ বছরে ১৬টি শিরোপা, কেন স্পেন এখন ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তি

ছবির উৎস, David Ramos/Getty Images
স্পেন আবারও করে দেখাল।
দুই বছর আগে বার্লিনে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, এবার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো লা রোহা।
এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর ২০১০ সালেও তারা বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল।
স্পেনের এই সর্বশেষ সাফল্য পুরুষ ও নারী– উভয় ফুটবলে তাদের অসাধারণ আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশ একই সময়ে পুরুষ ও নারী- দুই বিভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের নারীরা ২০২৩ সালে সিডনিতে অনুষ্ঠিত নারী বিশ্বকাপ জিতেছিল।
এটাই শেষ নয়। পুরুষ দল ২০২৩ সালে নেশনস লিগ এবং ২০২৪ সালে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক জিতেছে। অন্যদিকে নারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগের শিরোপা জিতেছে।
প্রকৃতপক্ষে গত পাঁচ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত স্পেন মোট ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপীয় শিরোপা জিতেছে।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগে বিবিসি স্পোর্টকে বলেছেন, "এটি একটি আধিপত্য"।
"এটা যেন সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাওয়া। আমাদের সংস্কৃতিগতভাবে একটি নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে এবং সবাই সেটিতে বিশ্বাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা থেমে থাকি না," বলেছেন তিনি।
"এটি আরেকটি এভারেস্ট জয়ের মতো, কারণ ২০১০ সালে পুরুষ দল ইউরো জয়ের দুই বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবারও আমরা একই কাজ করলাম"।

ছবির উৎস, Carl Recine/Getty Images
স্পেনের জয়ের মেশিন
নারী ফুটবল (২০২২-২০২৬: মোট ১১টি শিরোপা)
সিনিয়র দল-
১টি বিশ্বকাপ (২০২৩)
২টি নেশনস লিগ (২০২৪, ২০২৫)
অনূর্ধ্ব-২০: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২)
অনূর্ধ্ব-১৯: ৫টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫, ২০২৬)
অনূর্ধ্ব-১৭: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২) ও ১টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪)
পুরুষ ফুটবল (২০২২-২০২৬: মোট ৫টি শিরোপা)
সিনিয়র দল- ১টি বিশ্বকাপ (২০২৬) , ১টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪) ও ১টি নেশনস লিগ (২০২৩)
অনূর্ধ্ব-২৩: ১টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০২৪)
অনূর্ধ্ব-১৯: ১টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৬)

ছবির উৎস, Tiego Grenho/MI News/NurPhoto via Getty Images
দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়োগ দেওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন স্পেন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়, তখন খুব কম মানুষই ধারণা করেছিলেন যে এত অল্প সময়ে তিনি নেশনস লিগ (২০২৩), ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪) এবং বিশ্বকাপ (২০২৬) জয় করাবেন।
কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে শেষ ষোলোতে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকে দায়িত্ব ছেড়ে দেন, ফলে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে নতুন কোচ খুঁজতে হয়েছিল।
বালাগে বলছেন, "তারা এমন একজনকে বেছে নিয়েছিল, যিনি স্পেনের খেলার ধরণ এবং পুরো ব্যবস্থাটি খুব ভালোভাবে বুঝতেন। এটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় না কেউ ভাবতে পেরেছিল তিনি এতটা সফল হবেন"।
এই সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ার কারণ ছিল, দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কখনো কোনো বড় ক্লাব পরিচালনা করেননি।
১৯৯৪ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর তিনি বিভিন্ন ক্লাবে প্রায় ১৫ বছর ধরে নানা দায়িত্ব পালন করেন। নিচের ধাপের লিগের কোচিং, যুব দলের দায়িত্ব এবং সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করার পর তিনি স্পেনের যুব দলগুলোর কোচ হন।
স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "দে লা ফুয়েন্তে একাডেমি থেকেই এই খেলোয়াড়দের অধিকাংশকে চিনতেন এবং তারা দল হিসেবে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এটি শুধু বর্তমানের দল নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি অসাধারণ দল"।
অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের দায়িত্ব পালনের পর সিনিয়র দলের কোচ হওয়া দে লা ফুয়েন্তে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান, ধৈর্য এবং শান্ত থাকার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন।
শুক্রবার নিউইয়র্কে ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, "তোমাদের বেশিরভাগই আমার চেয়ে ছোট, তাই অভিজ্ঞতাকে সম্মান করতে শিখতে হবে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কয়েকজন ফুটবলার আমাকে বলেছিল, কোচ, এখন আর জেতার কী বাকি আছে? আমরা তো সব বয়সভিত্তিক পর্যায়েই সবকিছু জিতে ফেলেছি। তখন আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে এখন আমাদের লক্ষ্য শুধু সেপ্টেম্বরের পরবর্তী ম্যাচ, কারণ এই দল কখনো থামে না"।
জাতীয় দলের এই সাফল্যের প্রভাব ক্লাব ফুটবলেও পড়েছে।
পেপ গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটিতে ট্রফিভরা ১০ বছর কাটিয়ে ক্লাব ছেড়ে দিলেও, ২০২৬-২৭ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে দায়িত্ব নেওয়া কোচদের অন্তত এক-চতুর্থাংশই স্প্যানিশ।
বর্তমানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত, যা ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ অপরাজিত থাকার রেকর্ড।

ছবির উৎস, Catherine Ivill - AMA/Getty Images
'আমরা সবকিছুই জিতছি'
এদিকে গত এক দশকে স্পেনে নারী ফুটবলের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে এবং এখন তারাও বড় মঞ্চের ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছে।
তিন বছর আগে নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেন যে শিরোপা জিতেছিল, সেটি ছিল এই টুর্নামেন্টে তাদের মাত্র তৃতীয় অংশগ্রহণ। তারা প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০১৫ সালে।
এরপর স্পেনের নারী দল ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগ জিতে সেই সাফল্যের ধারা বজায় রাখে।
স্পেনের সাবেক ফুটবলার এবং বর্তমানে সাংবাদিক মারিয়া গারিদো ২০২৪ সালে বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "স্পেনে নারী ফুটবলের পরিবর্তন সত্যিই অসাধারণ। দশ বছর আগে, যখন আমি এফসি বার্সেলোনার হয়ে খেলতাম, তখন মেয়েদের জন্য লা মাসিয়া (বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি) ছিল না। আমাদের যাতায়াতের খরচ নিজেদেরই বহন করতে হতো, বাবা-মায়েরা আমাদের অনুশীলনে নিয়ে যেতেন, আর আমরা কোনো পারিশ্রমিকই পেতাম না"।
"কিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। নারী ফুটবলের উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আরও বেশি বয়সভিত্তিক দল গঠন, উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মেয়েদের জন্য আলাদা ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা। এই পরিবর্তন শুধু নারী ফুটবলে বিপ্লবই ঘটায়নি, বরং স্পেনে নারী ফুটবলের প্রতি মানুষের সম্মানও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে," বলেছেন তিনি।
পুরুষ ও নারী—উভয় জাতীয় দলের এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত এক দশকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে অসংখ্য শিরোপা জয়ের মাধ্যমে।

ছবির উৎস, Getty Images
'জয় আরও জয়ের জন্ম দেয়'
স্পেনের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকের বিশ্বাস, দেশটির এই আধিপত্য আরও লম্বা সময় ধরে অব্যাহত থাকবে।
পুরুষ দলে লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি- এই দুই অসাধারণ তরুণ প্রতিভা মাত্র ১৯ বছর বয়সেই নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী পদক জিতেছে।
একই বয়সে স্পেনের নারী দলের খেলোয়াড় ভিকি লোপেজ বার্সেলোনার হয়ে তিনবার উয়েফা নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন।
এছাড়া ফরোয়ার্ড সালমা পারাইয়ুয়েলো ২৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্পেন জাতীয় দলের হয়ে ৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন।
ইয়ামাল বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হয়েছেন। তার আগে রয়েছেন ব্রাজিলের পেলে (১৯৫৮ সালে ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে) এবং ইতালির জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২ সালে ১৮ বছর ২০১ দিন বয়সে)।
অন্যদিকে ১৯ বছর ১৭৮ দিন বয়সে কুবারসিও রবিবারের ফাইনালে শুরুর একাদশে ছিলেন। ফলে স্পেনই বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল যারা এক ম্যাচে দুইজন কিশোর (টিনএজার) খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়ের পর ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "স্পেনের খেলার ধরন এমন, যার কাছাকাছিও পৃথিবীর আর কোনো দল পৌঁছাতে পারেনি। এই বিশ্বকাপে কেউই তাদের চাপে ফেলতে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে তাদের পোস্ট লক্ষ্য করে মাত্র ১০টি শট হয়েছে"।
এদিকে, ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি ফক্স স্পোর্টসকে বলেন, স্পেনের সামনে আরও বহু বছর বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, "আমি তাদের পুরো ফুটবল কাঠামো এবং যে ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে, তার কৃতিত্ব দিতে চাই। কারণ আগে স্পেন এভাবে জিতত না। কিন্তু এখন তারা প্রতিটি স্তরেই শিরোপা জিতছে"।








